প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা গেলে কমবে ফিস্টুলা
২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলা রোগমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে। ফিস্টুলা রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলে রংপুর বিভাগের আট জেলায় কাজ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পঞ্চগড় জেলাকে ফিস্টুলা মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে এলএএমবি ট্রেনিং সেন্টারে আয়োজিত ‘ফিস্টুলা রোগ নির্ণয়, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও রিপোর্টিং’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ফিস্টুলা রোগ বিশেষজ্ঞরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের দুটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের প্রায় ২৪ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
লুথেরান এইড টু মেডিসিন ইন বাংলাদেশ (এলএএমবি) ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের অর্থায়নে জেনিটাল ফিস্টুলা বাই ক্যাপচারিং, ট্রিটিং, রিহ্যাবিলিটেটিং অ্যান্ড রিইনটিগ্রেটিং ইন বাংলাদেশ (এফআরআরইআই) প্রকল্পের অধীনে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর এবং ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত সহায়তা করে।
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিশেষজ্ঞরা সময়মতো বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনার জন্য প্রসূতি ফিস্টুলা রোগীদের প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, গ্রামীণ সমাজে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষত ধাত্রী বা গাইনী তুলনামূলক কম। এ কারণে প্রসবকালীন গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্তের অনেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। এ পরিস্থিতিতে প্রসূতির নিরাপদ প্রসবের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি খুবই জরুরি। অল্পবয়স্ক মায়েরা বেশি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন। এটা মূলত বাধাগ্রস্ত ও বিলম্বিত প্রসবের কারণে হয়ে থাকে।
প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ল্যাম্বের কমিউনিটি হেলথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিএইচডিপি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক উৎপল মিঞ্জ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরআরইআই প্রজেক্ট (ল্যাম্ব) ম্যানেজার মাহাতাব উদ্দিন লিটন। ফিস্টুলা রোগ-সম্পর্কিত ধারণাপত্র তুলে ধরেন ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার ডা. তাহারিমা হোসেন সোনিয়া।
এছাড়া ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অফিসার ডাঃ অনিমেষ বিশ্বাস মহিলাদের জেনিটাল ফিস্টুলার বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রকল্প এলাকার রোগীদের দুর্ভোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন। তিনি ফিস্টুলার প্রাথমিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নার্সদের গুরুত্ব বর্ণনা তুলে ধরের এবং সঠিক ডকুমেন্টেশনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। ল্যাম্ব হাসপাতালের সিনিয়র রেজিস্ট্রার (স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি) ডা. হাফিজা এবং সুইজারল্যান্ডের গাইনোকোলজির ডা. বিয়া এবং ল্যাম্ব হাসপাতালের প্রসূতি পরামর্শদাতা এবং ফিস্টুলা সার্জন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিভিন্ন সেশনের সুবিধা প্রদান করেন।
ডা. হাফিজা অংশগ্রহণকারী সিনিয়র নার্সদের সঠিক ইতিহাস বিশ্লেষণ এবং রোগীদের শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে কীভাবে ফিস্টুলা রোগ নির্ণয় করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন। ডা. বিয়া কিভাবে রোগীদের সাথে মোকাবিলা করতে হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের কাছ থেকে সরাসরি ব্যবহারিক জ্ঞান সংগ্রহ করে তাদের যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনতে শিখিয়েছিলেন।
এসময় বিশেষজ্ঞরা ফিস্টুলা রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে বেশি গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিলম্বিত প্রসব বা বাধাগ্রস্ত প্রসব, বাল্যবিবাহ ও কম বয়সে গর্ভধারণ, জরায়ুতে অস্ত্রোপচার, অদক্ষ ধাত্রী বা প্রতিবেশীর মাধ্যমে ডেলিভারি করানোসহ সচেতনতার অভাবে ফিস্টুলা রোগ বাড়ছে। ফিস্টুলা রোগ কী, আক্রান্তের কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি, শনাক্তের উপায়, চিকিৎসাসেবা ও প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলোও নিয়ে আলোচনা করেন তারা।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দিনাজপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আরজ উল্লাহ, বিরল ইউএইচএফপিও ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মোকাদ্দেস ও পঞ্চগড় সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. এস এম শরীফ আফজাল। তারা জেনিটাল ফিস্টুলা রোগীদের ভোগান্তি নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে ফিস্টুলা নির্মূলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ল্যাম্ব এফআরআরইআই প্রকল্পের প্রশংসা করেন।



