কাউনিয়ায় দীর্ঘ ৫০ বছর পর শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের নাম মুছে ফেলায় এলাকাবাসির ক্ষোভ, পুনরায় নামকরণের দাবী
কাউনিয়ায় দীর্ঘ ৫০ বছর পর শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের নাম মুছে ফেলায় এলাকাবাসির ক্ষোভ, পুনরায় নামকরণের দাবী
সাইফুল ইসলাম কাউনিয়া(রংপুর)প্রতিনিধিঃ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাটে চাকরীরত অবস্থায় পাকবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহত হন রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার মোফাজ্জাল হোসেন।
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সকাল ১০টায় জেলার রেলওয়ের ওভার ব্রীজের পশ্চিম পাড়ের রিক্সা ষ্ট্যান্ডে ডাঃ আব্দুর রহমান, ডাঃ মোক্তাদির, ডাঃ এ.জি আহমেদ, শহীদ মোফাজ্জল হোসেন ও রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৫শতাধিক লোককে ধরে এনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনা ও তার এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা। উর্দূভাষী বিহারী অধুষ্যিত লালমনিরহাট জেলা শহরে পশ্চিমা শোষক ও তাদের দোসরদের বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উৎখাত করার দৃঢ় সংকল্পে চারিদিকে শ্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। শুরু হয় পাকিস্তানী বাহিনী ও উর্দূভাষী বিহারী তথা অবাঙ্গালী কর্তৃক নির্মম হত্যাকান্ড এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড। সেই হত্যাকান্ডে অন্নান্যদর সাথে সেদিন শহীদ হন মোফাজ্জল হোসেন। দেশ স্বাধীনের পর স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গনের সহায়তায় ক্যাপ্টেন মনছুর ১৯৭৩ সালে শহীদ মোফাজ্জল হোসেনকে স্বরণ করে রাখতে তার নিজ এলাকা রংপুরের কাউনিয়া রেলওয়ে ষ্টেশনে নির্মান করেন শহীদ মোফাজ্জল তোরণ। পরবর্তীতে কাউনিয়া রেলওয়ে ষ্টেশনে অবস্থিত ওভার ব্রীজটির নামকরণ করা হয় শহীদ মোফাজ্জল হোসেন ওভার ব্রীজ নামে। কিন্তু প্রায় দীর্ঘ ৫০ বছর পর সেই ওভার ব্রীজটিতে লেখা শহীদ মোফাজ্জল হোসেন ওভার ব্রীজ মুছে ফেলেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বীর বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সুধীজনের সাথে কথা বলে জানাযায়, ১৯১২ সালের ২০ জানুয়ারী রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের বছর উদ্দিন সরকারের পরিবারে জন্মগ্রহন করেন শহীদ মোফাজ্জল হোসেন। লেখা পড়া শিখে যোগদান করেন রেলওয়ে লালমনিরহাট ডিআরএম এর কার্যালয়ে ১৯৪৭ সালে তিনি জেলা প্রধানের বিশেষ অনুমতি নিয়ে বোর্ড নির্বাচনে অংশগ্রহন করে বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ৪ বছর সততার সাথে বালাপায়া ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি এলাকার ছেলে মেয়েদের মাধমিক শিক্ষার কথা চিন্তা করে নিজের নামীও ২০ বিঘা জমি দান করে প্রতিষ্ঠা করেন কাউনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরবর্তীতে যার নামকরণ করা হয় মোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে সরকার জাতীয়করণ করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ডাকে সায়া দিয়ে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। তাকে স্মরণীয় করে রাখতে লালমনিরহাট শহীদ মিনারে অন্যান্য শহীদদের নামের সাথে তার নামটি রাখা হয় ৮ নাম্বারে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে কাউনিয়া রেলওয়ে ষ্টেশনের শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ এবং ১৯৭৮/৭৯ সালে শহীদ মোফাজ্জল হোসেনকে স্মরণীয় করে রাখতে ওভার ব্রীজের নাম করণ করা হয় শহীদ মোফাজ্জাল হোসেন ওভার ব্রীজ। দীর্ঘ৫০বছর পর সেই নামটি মুছে ফেলায় উপজেলা বীর মুক্তিযোদ্ধ,জনপ্রতিনিধি, সুধিজনসহ সর্বস্থরে নিন্দার ঝর বইছে।
কাউনিয়া মোফাজ্জল হোসেন মডেল সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, শহীদ মোফাজ্জল হোসেন নামটি কাউনিয়া উপজেলার গর্ব। ওভার ব্রীজ থেকে তার নাম মুছে ফেলায় তিনি বিষ্মীত। কাউনিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রেলওয়ের যে কর্মকর্তা একজন শহীদের নাম মুছে ফেলতে পারে সে অবশ্যই স্বাধীনতার বিপক্ষের। তিনি এমন ন্যাক্করজনক কাজের তীব্র নিন্দা জানান এবং পুনরায় শহীদ মোফাজ্জল হোসেন এর নাম লেখার জোড় দাবী জানান।
এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী কমান্ডার(দুলাল) সরদার আব্দুল হাকিম বলেন, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন মনছুর যিনি স্বরাষ্ট্র এবং যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন তাকে দিয়ে কাউনিয়া রেলওয়ে ষ্টেশনের পশ্চিম পাশে শহীদ মোফাজ্জল হোসেন তোরণ উদ্ধোধন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮/৭৯ সালে সেটি ভেঙ্গে ফেলে কাউনিয়া ষ্টেশনে রেল অবরোধ করে তৎকালীন লালমনিরহাট ডিআরএম এবং কাউনিয়া ষ্টেশন মাষ্টার আব্দুল কুদ্দুসসহ ওভার ব্রীজের নামনীয় করে রাখতে করণ করেন শহীদ মোফাজ্জল হোসেন ওভার ব্রীজ। একজন শহীদকে সম্মান দিয়ে তাকে স্মরনীয় রাখতে দীর্ঘ ৫০ বছর যে নামটি ব্যবহার হয়ে আসছে সেই নামটি যে মুছে ফেলেছে সে অবশ্যই স্বাধীনতার বিপক্ষের। তিনি রেলমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, যে ব্যক্তি শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের নাম মুছে ফেলেছে তাকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্ত মূলক শারি দাবী করেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে পুনরায় শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের নাম লেখা না হলে ৭৮/৮৯ তে যেমন রেল অবরোধ করেছি প্রয়োজনে আবারো রেল অবরোধ করবেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউনিয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার হোসনে মোবারক জানান আমি কিছুই জানি না আমি নতুন এসেছি। তবে শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের নামটি নথি পত্রে ছিল কিনা সে বিষয়ে খোজ খবর নেয়া হচ্ছে। তার নাম কেন মুছে ফেলা হল সেই বিষয়ে আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বলতে পাড়বে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী জোনের সিএমই/পশ্চিম, আব্দুল মতিন চৌধুরী বলেন আমরা নাম পরিবর্তনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি কেন এরকম হলো।
এই বিষটির সর্ম্পকে জানতে আপনারা রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী জোনের অতিঃ সিএসটিই/পশ্চিম ও সিপিও/ পশ্চিম (অতিঃ দায়িত্ব) অসীম কুমার তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করুন। তবে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী জোনের অতিঃ সিএসটিই/পশ্চিম ও সিপিও/ পশ্চিম (অতিঃ দায়িত্ব) অসীম কুমার তালুকদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
শহীদ মোফাজ্জল হোসেনের দ্বিতীয় ছেলে ও সাবেক জাতীয় দলের ফুটবলার মোসাব্বের হোসেন বলেন আমার বাবা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাটে চাকরীরত অবস্থায় পাকবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছেন। কিন্তু তার স্মৃতি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ্যই মুছে ফেললো এটা খুবই দুঃখ জনক বিষয়। আমাদের দাবি পুনরায় তার নামে নামকরন করে আমার বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ্য সহোযোগিতা করবেন।



